ইসরাত জাহান আশা

অত:পর চন্দ্রবিন্দু

অত:পর চন্দ্রবিন্দু

তুমি আমার ঠিক কতটা জুড়ে আছো তা তোমার কল্পনাতীত। তোমাকে আমার হৃদয়বৃত্তান্ত না বলতে পারার দু:খ যেন শীতের রাতে গভীর অন্ধকারে আমার জোনাকপোকাগুলোকে অনায়াসে গিলে খাচ্ছে। এখন তো দু:খকেও আর দু:খ মনে হয়না।  হ্যাঁ, আমি আর নাই বেশিদিন- জানি। আমাকে ঘিরে এখন সব অর্থহীন সেও মানি। তবু তোমাকে বলতে চাই, তোমাকে আমার সবটা না বলে যে আমি থাকতে পারিনা। জানি, এতকাল ধরে কখনো তোমায় এসব বলা হয়নি; আমার হৃদয়ের পুরোটা জুড়েই তুমি। 

তোমাকে আগাম ভয় পাইয়ে দিতে চাইনা কিন্তু জানো, এখন আমার খুব ইচ্ছে করে তরুণ বজ্রের মতো চিৎকার করে সবার সামনে একটিবার তোমার নাম ধরে ডাকতে। তোমার নাম, সেই ডাকে তোমার ফিরে চাওয়া আমার ভীষণ প্রিয়। এখন মন চায় আবার পাশে পেলে তোমার হাত ধরে আমার কাছে নিয়ে আঙ্গুলে তোমার ঠোঁট দুটো রেখে স্নিগ্ধ আদর ছোয়াতে। শুনতে কটু লাগছে? আহ! কি করব- বলো? তুমিই তো আমার সকল আদর, ভালোবাসার একমাত্র অংশীদার। তোমার হৃদয়ের জ্বর যেন আমার কাছে অপ্রাপ্য সুন্দর, অদৃশ্য এক শিকলে আজও আটকে রেখেছে। 

দেখো- কি নিষ্ঠুর, আমি! আজও স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কথাই বলে যাচ্ছি। কি করব বলো? হৃদয়ের প্রয়োজনে নানান আয়োজন করে তোমায় সব বলতে হয়। এখন তো আর তোমায় কাছে পাই না যে দৌড়ে ওই স্টেশনের রাস্তা ধরে আমবাগানের সিঁড়িতে বসে তোমার সাথে গল্প করব। ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে যাবে, গোধূলি দেখতেই সন্ধ্যা এলিয়ে যাবে। 
ইশ! যদি এমন হতো, তোমাকে নিয়ে আমার মনে নিছক কোন ভাবনার উদয় হতো আর তা তুমি সঙ্গে সঙ্গে জেনে যেতে!

আমার ধৈর্য্যের পরিমান নিতান্ত অল্প। তড়িঘড়ি করেই তাই তোমায় কত নামে নামকরণ করতাম, এখনো করি। খেয়াল করলেই বুঝতে- ওই নামগুলোতে লুকিয়ে আছে তোমার মধ্যকার বৈচিত্র্যময় একেকটি লুক্কায়িত সত্তা। অগাধ ভালোবাসায়  উদ্ধার করেছি আমি সেসবের মানচিত্র। 
তুমি আমার একান্ত নিজস্ব। এই মনে হয় সবটা সুখ আবার এই যেন বেদনা। তোমাকে ভেবেই আমার হৃদয় যে কি ব্যাপক আন্দোলিত হয়- তার তুমি একাংশও জানোনা। তোমাকে ছাড়া এই যেন আর না চলা, না বসা! কি যে যন্ত্রণা! কি আর বলব? তোমাকে যে সব বলব সে শক্তিও আমার হয় না।

 

প্রিয় প্রাণকান্তি, 

তোমার বিবিধ দু:খ আর আমার ভালোবাসা,শুধু খুজে যাচ্ছে একটু প্রশান্তির ছায়া। এতো বুদ্ধিদীপ্ত রমনী হয়েও কোন কালেই তুমি বুঝতে পারোনি যে- তোমার খুব কাছে বসে থাকা কেউ, অতল সমুদ্রের নিভে থাকা ঢেউ! আমার বেশ মনে আছে- আগে যখন আমার সামান্য জ্বর হতো, তোমার উদ্বেগ, উৎকন্ঠার কোন সীমা থাকত না। দেখে মনে হতো- কি না কি যেন হয়ে গেছে আমার। তোমার অতি আদরেই আজ আমার এমন ভগ্নদশা! একটু অবহেলা পেলেই প্রাণে কাটা দিয়ে ওঠে। 

তোমার মত করে আমায় নিয়ে আর কেউ এত ভাবেনি। তোমার কাছে থাকা, উদ্বেগ, যত্ন সব কিছুতেই একটা সময় আমি যেন ভালোবাসা খুঁজে পেলাম। তোমার জন্যে আমার মন একেবারে মরিয়া হয়ে উঠল। ভেবেছিলাম তুমিও হয়তো.... ! অথচ তুমি তো মুখ ফুটে আজ অবধি কিছু বলোইনি। তবু মনে হতো, মনে হতে তো আর কোন কারণ লাগে না। নিছক এ হয়তো আমার কোন মিথ্যে ভাবনা। আবার এও হতে পারে তোমার তৈরি কোন এক অদৃশ্য দেয়ালের আড়ালে চাপা পরে আছে এই প্রশ্নবোধক!

আচ্ছা- প্রিয় পদ্মপাতা, কেনো রেখেছিলে আড়ালে তোমার স্বপ্নকথা? কে ছিল নিভৃতে তোমার হৃদয়ে?

একবার কথায় কথায় আমি তোমাকে বলে বসেছিলাম- দেখো, আমাকে নিয়ে খুব ভয় হবে যার!  খুব কাছে গেলেই মুগ্ধতা কেটে যাবে তার!! সে নিয়ে কি তর্ক-বিতর্ক বাধিয়েছিলাম আমরা, তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে? 

আমার বেশ ভালো মনে পরে মাঝে মাঝে যখন তোমাকে ছাড়া এখানে ওখানে আড্ডা মেরে আসতাম, জানতে পেলেই তুমি কেমন মুখ ফুলিয়ে নিস্প্রভ হয়ে বসে থাকতে! কি হয়েছে, জানতে চাইলেও কিছুই বলতে চাইতে না। আমার এখনো চোখে ভাসে তোমার ওই মুখখানি। তুমি কি এখনো ওমনই আছো? নাকি হারিয়ে গেছো? তোমার মধ্যে নিহিত আমার সব সুখ কি ফুরিয়ে গেছে?

তখন, আমি যত যাইযাই করতাম মেঘের বাড়ি!
তোমার আকাশ যেন হয়ে উঠত
এক ঈর্ষাকাতর তাঁতের শাড়ি!

তুমি কত কিছু নিয়ে অনর্গল আমাকে বলতে, পাড়ার সিরাজ চাচার চায়ের দোকান থেকে বিশ্ব রাজনীতির দরবার সব যেন তোমার কাছে একেবারে পরিষ্কার, সব খবর তোমার নখদর্পনে। ওসব নিয়ে অযথাই আমার কত কি জানা হতো। অথচ তোমার খবর, তোমার গল্প যা জানার জন্যে আমি সদা উন্মুখ হয়ে তোমার সামনে বসে থাকতাম তার কিছুই কখনো জানা হলো না।

কোনরকম প্রায় আড়াইশো টাকার একটা ছোট খাটো চাকরি পেতেই তোমায় নিয়ে সুযোগ পেলেই হৈ হুল্লোড় করতে বেড়িয়ে পড়তাম। কখনো দেড় ঘন্টার জন্যে একটা রিকশা ভাড়া করে দুজনে দিব্যি পুরো শহর টইটই করে ঘুরে বেড়াতাম। তবু আমাদের কথা ফুরাতো না! কত কি বাদ পরে যেত। সেই আবার বাড়ি ফিরে মন করত হাসফাস। প্রতি সপ্তাহের শনিবারে তোমার সাথে দেখা করার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম।

কেন যেন মনে হতো, খুব বেশি দিন আমরা একে অপরকে এভাবে আর কাছে পাবো না। এ বিষয়ে তোমার জানা নেই- কেন যেন ব্যক্তিগত ভাবে আমি বর্তমানে অগাধ বিশ্বাসী। ভবিষ্যতকে আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না, প্রশ্রয়ও দেইনা। ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য সুযোগ কম বরং অনুশোচনা বেশি তৈরি করে। তাই আমি আমার খুব প্রিয় কাজ, শখের কোনকিছু সামর্থ্যের নাগালে থাকলে আগামীকালের ভরসায় একদমই ফেলে রাখতাম না। এখনও ঠিক তাই। সে জন্যে পকেটের ভালো-মন্দ দশা ভাবা নেই, বলা নেই, কওয়া নেই, সু্যোগ পেলেই তোমার সাথে দিব্যি বেড়িয়ে পড়তাম। তোমার সাথে সময় কাটানো আমার কাছে মহামূল্য মনে হত। 

একদিন সব শুনে তুমি আমাকে কত কি ভালো মন্দ শুনিয়ে দিয়েছিলে। খুব একেবারে এসে পড়েছেন- দার্শনিক সাহেব!!! বাব্বাহ! সক্রেটিসের বংশোদ্ভূত কিনা দিন শেষে আমার কপালেই এসে জুটল? একেই বলে কপাল....!! আর এই বলেই তোমার কি হাসি! সে হাসি যেন আর থামেই না। আমি তোমাকে দেখছিলাম, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও একটু হেসেছিলাম। তোমাকে খুব বলতে মন চাইতো- জানো, জীবনের এক পর্যায়ে এসে - অর্থের প্রাচুর্যতা থাকলেও শখের মানুষগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে। আর যারা কোনোভাবে থেকে যায়, তাদের প্রতি আমাদের আগ্রহ কিংবা ভালোবাসা প্রায় নিভু নিভু প্রদীপের মতো একেবারে ক্ষীণ হয়ে পড়ে, যেন সময়ের প্রবাহে আবেগের তীব্রতা হারিয়ে যায়।

প্রকৃতপক্ষে, সময়ই পরিবর্তনশীলতার সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য নির্দেশক—যা মানুষ, সম্পর্ক ও অনুভূতির স্বরূপকে নীরবে রূপান্তরিত করে। 

কিন্তু তোমার ওই গর্বের বিজয়কে প্রতিহত করতে কার মন চাইবে-বলো? তোমাকে দেখলেই আর আমার বিদ্রোহী হতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হত না। তোমার জন্যে পুরো দুনিয়ার কাছে বিদ্রোহী হতে রাজী আছি আমি কিন্তু তোমার কাছে নয়।

তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, মিহিকার কথা? বেশ সুদীর্ঘ সময় যাবৎ আমরা একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পার করেছি- তুমি সেটা বেশ ভালো করেই জানো। সেই ১৯৮৬ সালের ঘটনা,ভর্তি পরীক্ষার প্রায় চারমাস পর আমার শ্রেনিকক্ষে আমাদের এক মাস্টার মশাইয়ের আগমন, ঠিক তখনই তার পাশাপাশি হেটে এক মেয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করল। স্যার ওকে নিয়ে অনর্গল নানান কথা বলতে রইলো, কিন্তু আমি যেন কোথায় হারিয়ে গেলাম। ওসব কোন কথাই আমার কানে ধরেনি। ওই চির অপরিচিতার দিকে আমি তাকিয়ে ছিলাম, মনে হচ্ছিল- কোথা থেকে, কে যেন আমার জীবনে এসে পড়েছে, হৃদয়ে কেমন উথাল-পাতাল হাওয়া বয়ে উঠল। কথাটা পড়লে যে কারোরই নেহাত হাসি পাবার কথা । যদি কেউ এই কথাকে আমার ভন্ডামি প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাতে আমার আর বিশেষ কিছু করার থাকবে না। কিন্তু আসল সত্য সময়ের সাথে সাথে গুরুতর আকার ধারণ করে এবং তা সবাই উপলব্ধিও করতে পারে। 

আমি খুবই শান্ত ও লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। কারো সাথে খুব একটা মিশতে পারতাম না। কথাও বলতাম না। শুধু চুপ করে এককোণে বসে থাকতাম। তবু কেমন করে যেন সেই মিহিকার সাথেই আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল! ধীরে ধীরে ওকে আমার খুব ভালো লাগতে আরম্ভ করল।  ওই অল্প বয়সে আমি যেন খামখেয়ালে শুধু ওরই ছবি আমার মন দেয়ালে আঁকতে শুরু করলাম। খুব বেশি দেরি না করে ৮৭ সালে ওকে একটা পত্র লিখে ফেলি- 

পত্রটা ছিল এমন-

প্রিয় মিহি,

শুনতে হাস্যকর মনে হতে পারে তবে আমি তোমাকে দুটো কথা বলব যার একটি তুমি জানো আর অন্যটি তুমি জানোনা। 

এখন সাল উনিশশো সাতাশি, 
আমি তোমাকে ভালোবাসি!

ইতি
ইয়ানভি জাভেদ

আমার এই চিঠির কোন উত্তর মিহিকার কাছ থেকে কখনো আসেনি। চিঠির প্রতিত্তোরের আশায় থাকতে থাকতে ওই ছোট্টকালেই মন বড় ব্যথিত হল। বেশ কিছুদিন তেমন কারো সাথে আর কথা বলি নি, এমনকি মিহিকার সাথেও না। মাঝে মাঝে মিহিকাকে দেখলেই ওর ওপর বড্ড রাগ হতো।
এরপর নিজেকে কোনরকম সামলে ফাইনাল পরীক্ষায় বসলাম। সেবার ফলাফলও তেমন আশানুরূপ হয়নি। তবে সময়ের সাথে সাথে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হল জীবন। মিহিকার সাথে আবার আগের মতোই চলা ফেরা শুরু। তবে ওসব প্রসঙ্গ আমরা কেউই আর কখনো টানিনি। 

এরপর আমরা সবাই কলেজে উঠি। যে যে যার যার পছন্দসই কলেজে ভর্তি হই। মিহিকা নরসিংদী চলে যাবার সময় একদিন বলে উঠল, 'জানিস, তুই আমার সব থেকে ভালো বন্ধু। যাই হয়ে যাক, আমরা কখনো হারাবো না। তুই আসিস নরসিংদীতে যখনই মন চায়। ছুটি পেলে কিন্তু আমিও মাঝে মাঝে এসে ঘুরে যাব। তখন সময় দিতে হবে, কোন বাহানা শুনব না।'

আমি কখনো যাইনি নরসিংদী। ছুটি পেলে মাঝে মাঝে ও আসতো ওর মামার বাড়িতে ঘুরতে, খবর পাঠালে দু-একবার দেখা করে আসতাম।

১৯৯২ এর সেপ্টেম্বর মাস, লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে মিহিরের সাথে চা- সিঙ্গারা খেতে বসেছি। ঠিক তারই মাঝে মিহির মিহিকার প্রসঙ্গ টেনে এনে বলল ওরা দুজনে এখন প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ আছে। শুনে যেন রীতিমতো একটা ঝটকা খেলাম। এরপর সিঙ্গারার বিল মিটিয়ে কবি নজরুল সড়কের রাস্তা ধরে হেটে অনেক দূর পথ চলে গেলাম। রাত্রি গড়িয়ে এলো।

এর মধ্যেই কিভাবে যেন বছর ঘুরে গেল, পরের বছর  নাটকীয়ভাবে আমার সাথে তোমার পরিচয়। তখন 
আমাকে জড়িয়ে ধরা কালো পর্দা আমার যতটুকু আলোকে বাধা দিয়ে সরিয়ে দিত তুমি তার সবটুকু সাথে নিয়ে আমার দিকে দীপ্তি হয়ে ছুটে এলে। কিন্তু তখনো আমি তা ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি। তোমার সাথে আমার হাসি খুশির দিন কাটতে লাগল। আমি আবার বাচতে শিখলাম, হাসতে শিখলাম। নিজেকে ভীষণ ভালোলাগতে শুরু করলো আর তা কেবলই তোমার জন্য।

এরপর আমার বন্ধুমহল, মিহিকা, পরিবারের কেউ কেউ তোমার সম্পর্কে জানতে শুরু করল। এত ঘনঘন পত্রালাপ চলছিল আমাদের মাঝে যে তা খুব সহজেই অন্যের নজর কাড়ত। সবাই ভাবত, তোমার সাথে বুঝি আমার কোন হৃদয়ঘটিত চক্কর চলছে। 

কিন্তু আমি সবাইকে বলতাম, ওমন কিছু নয়। সে খুব ভালো। কথা বললেই মন কেমন সজীব হয়ে ওঠে!

অসাধারণত্ব আমাকে বরাররই টানত আর সেটা সবাই জানতও। মানুষ হিসেবে আমি কতটা কৌতুহলী সেটা খুব বিশেষদেরই জানা ছিল। সাধারণ কোন কিছু আমার কখনো ভালো লাগে নি। সবার কাছে তখন তুমিও তাই অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব।

একদিন আমার বাসাতে কি এক দরকারে এসে তোমাকে নিয়ে আদ্যোপান্ত জিজ্ঞাসা করতে শুরু করতে লাগল, মিহিকা। আমি তাকে তোমার সম্পর্কে বেশ খুশিমনে জানাতে লাগলাম। এরপর মাঝেমধ্যেই তোমাকে নিয়ে আমার বন্ধুমহলে চর্চা হত।

কেউই তোমাকে বিশেষ পছন্দ করত না শুধু আমাদের অবন্তি ছাড়া। ও ছিল বেশ বুদ্ধিমতী, কারো চলাফেরা, বেশভূষা দেখেই তাকে অন্য দশজনের মতো পরখ করতে বসে বাকিদের সাথেই আবার গুলিয়ে ফেলার মত বোকা মেয়ে ও ছিল না। বাধাপড়া মানসিকতায় ও তেমন বিশ্বাস করত না বলেই হয়তো ওর তোমাকে বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় নি। যেটা অন্যদের বেলাতে ঠিকই হয়েছিল।

একদিন মিহিকার সাথে বাইরে বেরিয়েছিলাম কাগজের কাজে, সে তো সরাসরিই সেদিন বলে বসল- কিছু মনে করিস না, ঋদ্ধির মতো প্যান্ট-শার্ট পড়ে রাস্তা ঘাটে ঘুরে বেড়ানো মেয়ে আমার একদমই পছন্দ না। একটা ছেলেমানুষ যাকে চেনা নেই, জানা নেই- তাকে ওত পত্র লেখার কি আছে? মানুষ নিজের স্বামী- সন্তানকেও এত পত্র লেখে না। মানুষের কাজ কর্ম না থাকলে যা হয় আরকি। তার মধ্যে মেয়ের কেমন যেন একটা ডোন্ট কেয়ার, ডোন্ট কেয়ার ভাব, আর কি ভারী- ভারী কথা!! - আমি সব খবর বের করেছি নিদ্রা আর সুখনকে দিয়ে। তোর মনোযোগের কেন্দ্রে এসে ও কেবল তোর বলদামি আর ভালোমানুষির সুযোগ নিতে চাইছে। আর তুই-ই বা কি এমন খুজে পেয়েছিস ওর মাঝে, এত এত মেয়ে থাকতে?? আগে থেকেই সাবধান হয়ে যা। পরে এসে আমাদের কাছে কান্নাকাটি করতে পারবি না। এসব মেয়েমানুষ খুব ডেঞ্জারাস! তোকে শুধু ও ওর প্রয়োজনের হাতিয়ার বানাচ্ছে সুযোগ বুঝে কাজে লাগানোর জন্যে। এত সময় আছে নইলে কারো কাউকে পত্রে এত এত অযাচিত ফাও প্যাচাল লেখার? নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে এই মেয়ের। আমার সন্দেহের ঘ্রাণ প্রবল! আমি ওর দিকে চেয়ে ওকে উত্তর দিলাম, দেখ- ঋদ্ধি, কেবলই আমার ভালো বন্ধু। আমি ওকে নিয়ে এর থেকে বেশি কিছু ভাবি না। সেও তাই। আমার মত কোন অকালকুষ্মাণ্ডকে বলির পাঠা বানিয়ে ওর কি এমন লাভ? ওর বলির পাঠা হওয়ার জন্যে গিয়ে দেখ ছেলেদের একদিল বিশাল লম্বা লাইন ধরে আছে। আর আমি তো আর ওকে বিয়ে করতে যাচ্ছি না যে ওত শত আমাকে ভাবতে হবে। বন্ধুত্ব কি ওতো কিছু হিসেব করে হয় নাকি?? ও আমার দিকে চোখ গরম করে চেয়ে বিদ্যাভবন রোডের দিকে একা একাই চলে গেল।

এরপর তোমার সাথে আমার দেখা, কত চোখাচোখি, একসাথে আড্ডা আর সময় কাটানো!! সব শুরু হয় সবার সামনেই।

এরপর থেকে হুট করে বন্ধুদের সামনে তোমার কথা কেউ বলে উঠলে  সব থেকে বেশি বিরক্ত হয়ে পড়ত ওই মিহিকাই। একবার এক বন্ধু মিহিকার অবর্তমানে বলে উঠল, মিহিকার সামনে ঋদ্ধির নামই উচ্চারণ করিস না। মিহিকা ওর কথা একেবারেই শুনতে পারে না।  মনে হয় ও তোকে পছন্দ করে। এত বছরের জানা- শোনা তোদের!!
আমি আমার ওই বন্ধুকে বলে উঠলাম, কি যা-তা বলছ! তা হবে কেন? এমন হলে সে তা আমাকে নিজ মুখেই বলত।
তোর কি মনে হয়, ও নিজ মুখে তোকে ওসব বলবে? আর ওকে দেখেই বোঝা যায়, আমিই বুঝতে পারি আবার নাকি মুখ দিয়ে বলা লাগবে তোকে।
অবশ্যই বলা লাগবে, তুই তো আর কারো মনের খবর জানিস না, হয়তো ঋদ্ধিকে খুব একটা পছন্দ না জন্যেই ও ওমন আচরণ করে।  আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যদি ওমন কিছু হত তবে ও তা আমাকে নিজে থেকেই সবার আগে জানাত।

মিহিকা যদিও আমাকে কখনো সরাসরি ওমন কিছু বলেনি। কিন্তু সে খুব তোমার প্রসঙ্গ টেনে আমাদের খোজ খবর জানার চেষ্টা করত। 

একদিন মিহিকার সাথে ওর মামার বাসাতে যেতে হল,তখন ৯৭ এর শেষ ভাগ, নভেম্বরের সন্ধিক্ষণে, প্রকট শীত। ওর মামাতো বোন প্রকৃতি খুব অসুস্থ। মামা ব্যবসার কাজে আসামে গেছেন। প্রকৃতিকে নিয়ে তখন আমরা দুজনই নানান দিকে ছোটাছুটি করলাম। প্রকৃতি প্রায় সুস্থ হতে লাগল, ওমন সময় মিহিকারও আর না ফিরে গিয়ে উপায় নেই। ওকে বাসস্ট্যান্ড অবধি ছাড়তে গেলাম, ও আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল- ঋদ্ধিকে এখন তোর খুব ভালোলাগে তাই না? ও কেমন ভালোলাগার কথা জিজ্ঞেস করছে তা আমি দিব্যি বুঝতে পারলাম। আমি ওর দিকে না চেয়েই বলে উঠি- কই নাতো। এখন আর আমাকে তোর একটুও ভালোলাগে না? আমি খুব অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইলাম। কি বলব তা আর ভেবে পাচ্ছিলাম না। 
সে তো চলে গেল কিন্ত আমার ভাবনার আকাশ একেবারে লণ্ডভণ্ড করে গেল।

আমি তখনো মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম যে আমি ওকে ভালোবাসি। সে যদি একটিবার আমায় ভালোবাসার অধিকার দেখিয়ে তোমার থেকে দূরে থাকবার আশ্বাস চাইতো, আমি হয়তো তখনই বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না দেখিয়ে তার অভিপ্রায়কে অগ্রে রেখে, শুধু নির্দেশনা কর্ণপাত করেই তোমার থেকে দূরে সরে আসতাম আর তাকে কেন্দ্র করেই পুনঃরায় সুখে মজিবার অপচেষ্টা করতাম। বিশ্বাস করো, তখনো আমি তোমার সাথে যত সময়ই কাটিয়ে থাকি না কেন, মন কেন যেন ওর চিন্তাতেই সদা মশগুল থাকত। তোমাকে নিয়ে ওর বলা কথাগুলোও সর্বদা শুধু মাথায় ঘূর্ণিপাক খেতো। আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম যে কোন একদিন ও মুখ ফুটে কিছু একটা বলবে যার মাধ্যমে সকল ধোঁয়াশার নির্মূল হবে। আমার অপেক্ষার দিন ফুরাবে। কিন্তু আসলে ওমন কিছু নয়।

এরপর প্রকৃতি আমার খোজ নিতে প্রায়ই বাড়ি আসতে লাগল। ওর সাথে দেখা হত, মাঝে মাঝে আগ্রহের বিষয়ে মিল পেলে তা নিয়ে স্বল্প আলাপ করতাম। নিতান্তই সে মিহিকার বোন বলে তার সাথে অহেতুক সময় কাটাতে হতো ভদ্রতার খাতিরে। এরপর আবার প্রকৃতি আমার জীবনে নানা প্রতিকূলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা শুরু করল, নিতান্ত ওর পাগলামো বলো কিংবা ছেলেমানুষী। ওসব আর সহ্য করতে না পেরে আমি হঠাৎ ঢাকায় চলে আসি।

এখানে এসে যেন আমি নিতান্ত এক ছন্নছাড়া শিশিরকণা হয়ে জমে উঠলাম। তোমার কথা ওত ভাবিনি কখনো অথচ তোমার উষ্ণতাতেই আমাতে সামান্য প্রাণ এলো। আমার অসুবিধে হয় পাছে সেই ভেবে তুমি কত কি ব্যবস্থা করে দিলে।
এরপর তোমাকে দেখতে দেখতেই আমার আধেক জীবন পার হয়ে গেল। কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি আমি এভাবে কারো প্রেমে পড়ে যাব।
তোমার সাথে একেকটা বিকেল কাটাতে কাটাতে আমি যেন আমার জীবনের সব বৃষ্টি ভুলতে বসেছিলাম। বিশ্বস্ততার এক রঙিন চাদরে তুমি আমায় কতই না যত্ন করে ঢেকে রেখেছিলে আর আমি কিনা সব দেখেও না দেখার ভান করে কত শতবার তা উড়িয়ে দিয়েছিলাম! 

ঋদ্ধি, তুমিতো আমার হৃদয় অলিন্দে গেঁথে আছো। যখন তোমাকে ভালোলাগতে শুরু হয় -তোমার রঙ, রূপ দেখে নয় বরং মানুষের চোখে মুখে রটা তোমার সব দোষের বৃত্তান্ত শুনে। তোমার দোষগুলোই যেন আমার কাছে একেকটা গুণ হিসেবে ধরা দিচ্ছিল। আমি তীব্রভাবে তোমার প্রতি একটা ঝোক অনুভব করছিলাম। তোমার ব্যক্তিত্ব আমাকে এতটা ছুয়ে গিয়েছিল যে ওমন এর আগে আর কখনো হয়নি। তোমাকে আরো বুঝতে, জানতে আমি যেন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎ্পাতের মত সদা উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলাম। এরপর থেকে তোমাকে যতটুকুই জানতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি, তা ছিল নিতান্তই অল্প। হয়তো তা হতে পারে কোন বিশাল সমুদ্র পটভূমির এক নিতান্ত ক্ষুদ্র বালুকণা! আর ওতটুকু ঠিক ওতটুকুতেই আমি তোমাকে ভীষন ভালোবেসে ফেললাম।

একটা মজার বিষয় লক্ষ্য করেছো কি কখনো?-
আমরা মানুষরা বড্ড সৌন্দর্য পিপাসু তাই দূর থেকে দেখলে পচা শামুকও আমাদের চোখে সুন্দর লাগে, ভালো লাগে। আর সেই ভালোলাগার মোহে পড়েই আমরা সেখানে পা বাড়াতে উদ্যত হই। এরপর সেই পচা শামুকেই আমাদের পা কাটে। পা কেটে যখন খুব রক্তক্ষরণ হয়, ব্যথা লাগে। তখন নিজেদের নির্বুদ্ধিতার খেসারত হিসেবে কেদে কেটেই আমাদের একেকটা দিন পার করতে হয়।

এরপর খুব কাছ থেকে খাটি সোনা দেখেও আমরা যেন আর তার কদর করতে পারিনা। তখন মনের অবস্থা এমন যে ভেজালে অভ্যস্ত আমরা যেন খাটির কদর করতেই ভুলে গেছি।

সোনা কাছে পেয়েও এবার সেটা কতটা খাটি তা দ্রুত পরখ করতে হবে। আর যেমন কথা তেমন কাজ, এবারে তার নমনীয়তা পরখ করতে আমরা কতই না ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি। উহাকে জ্বালাই -পুড়াই, যত পারি কষ্ট দেই।- শুধুমাত্র তা কতটা খাটি এই বুঝতেই। তুমি আমার জীবনে ঠিক এই খাটি সোনার মতোন। যার সঠিক মর্যাদা আমি দিতে পারিনি।

একটা সময় মনে হতো তুমি আমাকে ভালবাসো, কিন্তু আমাকে দিয়ে তুমি হয়তো সেই ভরসাটুকুই পাওনি, যার দরুন আমাকে তোমার সবটা বলা যেতো।
তোমার হয়তো প্রয়োজন ছিল আরো সৎ, দায়িত্বশীল, নম্র, কোমল একটা কাধ, যার কাছে তুমি নির্দ্বিধায়, নি:সংকোচে তোমার মাথা রাখতে পারো, পরম আনন্দে মনের আদ্যোপান্ত খুলে বলতে পারো। 
আচ্ছা, তুমি কি আমাকে তোমার মনের মতো করে একটুও সাজিয়ে নিতে পারতে না, তুমি কি সে চেষ্টা একটুখানিও করেছিলে?- এখন আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।
সে দিন গুলোতে যখন তোমার চোখের দিকে তাকাতাম, মনে হত যেন এক আনখ সমুদ্দুর, নিজস্ব কত কি যেন তুমি সেইখানে সযত্নে তুলে রেখেছো, কিছুই কি ছিল না সেইখানে আমার জন্য?

একটা সময়পর যখন আমার মনে তোমার জন্যে আমার অনুভূতির অবস্থান শক্তপোক্ত হতে আরম্ভ করল, তখন তোমার মধ্যে কেমন যেন একটা উদাস- উদাস ভাব। তোমার নির্বিকারচিত্ত, নিরানন্দভাব আর সব কিছুতেই শুধু বিরক্ত হয়ে ওঠা আমাকে বেশ ভাবাতে লাগল। তুমি তো ওমন ছিলে না!
তোমার সাথে থেকেও মনে হত তুমি আর সেই আগের তুমি নেই। আমি তোমার পুরোনো সত্তাকে রোজ তোমার মাঝে খুজে বেড়াতাম। তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কতবার, কি হয়েছে, মন খারাপ নাকি? তুমি বলেছিলে- মন খারাপ কেন হবে??
জানিনা, তোমাকে ঘিরে ধরেছিল কি এমন অমোঘ অসুখ, যার জন্যে সেই হাসিখুশি তুমি হয়ে গিয়েছিলে একেবারে চন্দ্রবিমুখ!!
আমি খুব করে চাইতাম কি জানো?
অলীক সন্ধ্যায় কেউ একজন আসুক,
তোমার কোলেতে মাথা রেখে সে ভীষণ হাসুক!
আর সেই 'কেউ' যেন আর কেউ নয় বরং আমি নিজেই হতে চেয়েছিলাম।

২০০৯ এ আবার একদিন দেখা হলো মিহিকার সাথে।বেশভূষায় চিনতে খানিক সময় লেগেছিল। ওকে আমি দৈনিক সকাল সন্ধ্যা কাগজের সভাকক্ষে দেখতে পেলাম। দেখতে তাকে বেশ লাগছিল, মনে হলো বেশ ভালোই আছে ও। এরপর কাজের ফাকে ওর সাথে কুশল বিনিময় করে আমি শাফির সাথে বের হয়ে গেলাম। তখন আমার কি দিন, কি রাত, শুধু কাজ আর কাজ! কাজের জন্যেই এদিক ওদিক হন্যে হয়ে ঘুরতাম ফিরতাম।

ওইদিন বুঝতে পারি, মিহিকার প্রতি আমার ভালোবাসা আসলে কখনো ছিলই না। এতগুলো দিন পর আবার ওর মুখোমুখি না হলে আমি হয়তো এ বুঝতেও পেতাম না যে আমি ওর প্রতি ঠিক কতটা নিরাসক্ত। ওকে হয়তো কোন একসময়ে আমার শুধুমাত্র ভালোলাগত। ভালোলাগা আর ভালোবাসার পথতো এক নয়। ভালোবাসলে মানুষ ভালোবাসার মানুষটাকে আগলে রাখতে শেখে। ওই মানুষটার ভালো-মন্দ লাগা, ভালো থাকাকে সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে শেখে। অসীম যত্নে মুক্তভাবেই বেড়ে ওঠে তখন ভালোবাসার শাখা প্রশাখা। এর রেশ কোনদিন বিন্দুমাত্রও কমে না, বরং দিনে দিনে আরো ওই মানুষটিকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে....।

আর ভালোলাগাতো কেবল আগ্রহ আর মোহের সম্মিলন। আগ্রহের ধূসরতা কেটে গেলেই ভালোলাগার রশিতে টানাপোড়েনের সূত্রপাত ঘটে, কাল বিলম্ব না করে সে রশি ছিড়েও যায়।

আচ্ছা- ঋদ্ধি, যদি কখনো আমার তোমাকে বলার সৌভাগ্য হতো- যাবে আমার সাথে, অনন্তের পথে? তবে কি নির্দ্বিধায় তুমি আমার সাথে যেতে না?
তোমার সাথে শাহজাহানপুরে একদিন, তখন শ্রাবণ মাস, রাস্তার গর্তগুলোতে বৃষ্টির কাদা-পানি টইটম্বুর করছে। তবু কত পথ দুজনে একসাথে হেটেছি, খেয়েছি; খুব আনন্দ হচ্ছিল সেদিন। যেন এমন কাউকেই আমি গুমোট আধারে বিস্তীর্ণ বিরানভূমিতে তৃষ্ণার্ত কাকের মতো এতকাল ধরে খুজে খুজে ধুকে বেড়াচ্ছি।  এইতো তাকে আমি পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি...!?

কিন্তু আমার আনন্দ আর সুদীর্ঘ হলো কই, ঋদ্ধি? 
ভালোবাসাকে সংশয়, সংকট ছাপিয়ে গেলে অনুশোচনাহীনা সেখানে আর কি থাকে- বলো? 

তোমার জীবনে আমি কেবল চন্দ্রবিন্দু হয়েই থেকে গেলাম।

এখন আমি এটাও জানিনা- 
কোথায়, কেমন আছে,
আমার ঋদ্ধি???