গৃহত্যাগী হওয়ার আগে গৌতম বুদ্ধের নাম ছিল সিদ্ধার্থ। হারমান হেসের যেই উপন্যাসের আলাপে এলাম, তার নায়কের নামও সিদ্ধার্থ। তবে কি গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে পশ্চিমা এক উপন্যাসের গল্প করছি? ভাবনাটা পুরোপুরি ভুল নয় বটে, তবে ঠিকও নয়। ‘সিদ্ধার্থ’ উপন্যাসের পটভূমি গৌতম বুদ্ধের সময়কার ভারতবর্ষই বটে। তবে এই গল্পের নায়ক সিদ্ধার্থ আর গৌতম বুদ্ধ (সিদ্ধার্থ) একদমই আলাদা মানুষ। একই সময়ে তাদের বসবাস, তবে মোক্ষ লাভের পথটা আলাদা।
অনেকদিন থেকেই পড়ব পড়ব করছিলাম কিন্তু পড়া হয়ে উঠছিল না। সেটাই বোধহয় ভালো হয়েছে। সম্প্রতি বইটা পড়ে যা বুঝতে পারলাম, আগে পড়লে পুরো রসাস্বাধন হতো না। প্রথমবার পড়ে মনে হয়েছিল, গভীরতর একটা বই পড়লাম বটে, তবে তল ছুঁতে পারলাম না। তাতে খানিকটা ভালোই হয়েছে। কিছু বই আছে বারবার পড়া হয়। কারণটা হচ্ছে, প্রতিবার মনে হয় কিছুটা অধরা থেকে গেল। আর ওই অধরেই যেন পুরো বইয়ের সোনার খনি! সৌন্দর্যের অংশ।
গল্পের নায়ক সিদ্ধার্থ খুঁজে ফেরে জীবনের চূড়ান্ত সত্য বা লক্ষ্য। সেই সত্যের হাতছানি অস্থির করে তোলে স্বচ্ছল সাজানো জীবনকে। প্রিয় বাবার আদেশ অমান্য করে, তার স্নেহ ছেড়ে, সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসীর জীবন গ্রহন করে। সত্যের সন্ধানের আশ্রয় নেয় বুদ্ধের আশ্রমে। কিন্তু সত্য যেন ধরা দেয় না। বুদ্ধের আশ্রম থেকে বিদায় নেয় সিদ্ধার্থ। সত্যের হাতছানি পায় বারাঙ্গনার বুকে। প্রেমে মত্ত হয়। এবারও সত্য শুধু উঁকি দেয়, ধরা দেয়না।
যৌবনের প্রেমের কাছেই বোধহয় সত্য আছে। এই ভাবনায় সেই প্রেমকে জয় করতে অর্থ-প্রাচুর্য সবই অর্জনে লেগে পড়ে সিদ্ধার্থ। কিন্তু প্রেম-অর্থ-প্রাচুর্য সব ছুঁয়ে দেখেও, সত্যকে ছোঁয়া হয় না তার। আবার অস্থির হয়ে ওঠে সিদ্ধার্থ। এতো দিনের লালিত প্রেম-প্রাচুর্য ছেড়ে চলে যায় ফের সত্যের সন্ধানে। দীনহীন এক মাঝি হয়ে সিদ্বার্থ কাটিয়ে দেয় বহুদিন। তবে সত্য তখনও শুধু উঁকি দিচ্ছে, ধরা দিচ্ছে না।
এরপর জীবনে সন্তান আসে, আবার চলেও যায়। সন্তান হারানোর বেদনা তাকে নতুন উপলব্ধি দেয়। নিজের মাঝে ফেলে আসা বাবাকে প্রতিমূর্তি দেখতে পায় সিদ্বার্থ। সন্তানের মাঝে দেখতে পায় নিজেকে। এবার অনুভূত হয়, পাওয়া-নাপাওয়া, অর্জন-বিসর্জন, মঙ্গল-অমঙ্গল, সত্য-অসত্য, পাপ-পুণ্য, সবই আসলে এক সুতোয় গাঁথা। সারাজীবন ধরে সেই সত্যকে খুঁজে ফিরেছে সিদ্ধার্থ, সেই সত্য এবার উঁকি দেয়া বন্ধ করে মুখ বের করল যেন। একসময় সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করে, চিরন্তন সত্যের সন্ধানে যাত্রা কখনও শেষ হয় না। সত্যের পথ যেন একটা বৃত্ত, যেখান থেকে শুরু হয়, বহু অভিযাত্রা আর পরিক্রমার পরে আবার সেই বিন্দুতেই ফিরে আসে। আমাদের স্বল্প জ্ঞানে সেটাকে ধারণ করার জন্য আমরা তাকে বিভক্ত করে দেখি বা উপলব্ধি করি। এজন্যই সেই সত্য আমাদের একেকজনের কাছে একেক রূপে ধরা দেয়। বহু রূপে সেই সত্যকে দেখা বা অনুভব করার পর আমাদের গল্পের নায়ক সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করতে পারে যে সেই চিরন্তন ‘সত্য’ সকল সময়ে সকল জায়গায় সমানভাবে বিরাজমান।
হার্মান হেসের এই অসাধারণ উপন্যাস পড়ার পরে পৃথিবীর দিকে তাকানোর দৃষ্টিটা যেন বদলে যায়। ক্ষুদ্র আর বৃহৎ, সঠিক আর ভুল, সবকিছুকে একটা এককের অংশ মনে হতে শুরু করে। আবার সেই অংশগুলো প্রত্যেকেই আবার পরিপূর্ণ একক। এই অনুভূতি শুধু অনুভব করা যায়, প্রকাশ করা যায় না।
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত (জাফর আলম অনূদিত এবং আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত) বাংলা অনুবাদটাও পড়ে ফেললাম। উদ্দেশ্য ছিল, বইয়ের আরেকটু গভীরে ঢোকার চেষ্টা করা। মূল বইটা জার্মান ভাষায় লেখা হয়েছিল। জার্মান তো পড়তে পারিনা, ইংরেজিতে কিছু ছুটে গেল কিনা সেটাই বুঝতে চাচ্ছিলাম। আরো কয়েকটা অনুবাদ চোখে পড়েছে। কিন্তু কোনোটাই জার্মান ভাষা থেকে সরাসরি অনুবাদ করা হয়েছে এমন দাবি নেই। যাই হোক, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে এই অনুবাদটা ভালো লাগলো। বইয়ের একটা উক্তি খানিকটা নিজের ভাষায় বলে বইয়ের আলাপ শেষ করব, “....পাপীর মধ্যে, তোমার মধ্যে, আমার মধ্যে, সবার মধ্যে যে বুদ্ধ লুকিয়ে আছেন তাকে চিনতে হবে।… এই সৃষ্টি কখনই অসম্পূর্ণ নয়, এই সৃষ্টি সবসময়ই পরিপূর্ণ; ধীরে ধীরে পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা তার নেই।…. দুধের শিশুর মধ্যে আছে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর বীজ, আবার প্রত্যেক মুমূর্ষু বৃদ্ধের মধ্যে আছে অনন্ত জীবনের হাতছানি।… সাধু পুরুষ লুকিয়ে আছেন ডাকাতের মধ্যে, আবার ডাকাতের খোঁজ পাওয়া যাবে পুণ্যবান পুরোহিতের মধ্যে। ….. এই জগতের সবকিছুই শুভ; জীবন ও মৃত্যু, পাপ ও পুণ্য, জ্ঞান ও নির্বুদ্ধিতা—সবই ভালো।….”
১৮৭৭ সালে জার্মানীতে জন্ম নেয়া হার্মান হেস মারা যান ১৯৬২ সালে। বাংলায় অনেক জায়গায় লেখকের নাম লেখা হয়েছে ‘হারমান হেসে’। ১৯৪৬ সালে একই বছরে সাহিত্যে নোবেল এবং গ্যোটে পুরষ্কার লাভ করেন। আমাদের আজকের আলোচ্য উপন্যাস ‘সিদ্ধার্থ’ প্রকাশ করেন ১৯২২ সালে। ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত হওয়ার পরেই মূলত বইটা বিশ্বের নজর কাড়ে। তারপর বেশ কিছু গায়ক, কবি, চিত্রাশিল্পী, চলচ্চিত্রকার, এই কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্প আর সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন। এই উপন্যাস থেকে ১৯৭২ সালে কোনার্ড রুকস তৈরি করেন সিনেমা। সেখানে অভিনয় করেছিলেন সেই সময়ের সুপারস্টার শশী কাপুর এবং সিমি গারেওয়াল। এই সিনেমা ইংরেজি হলেও সিনেমায় দুটো বাংলা গান ছিল। গানদুটো আমরা সবাই শুনেছি,
‘পথের ক্লান্তি ভুলে
স্নেহভারা কোলে তব
মা গো,
বল কবে শীতল হব।’
এবং
‘ও নদীরে,
একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে,
বল, কোথায় তোমার দেশ,
তোমার নেই কি চলার শেষ!’
সময় সুযোগ হলে বই আর সিনেমা দুটোরই স্বাদ নেয়ার পরামর্শ রইলো। তবে কে না জানে, সিনেমার চেয়ে বইয়ের স্বাদ অনেক বেশি