আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে খনিজ সম্পদে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র এই দেশকে সহায়তা করতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ থাকা সম্পদ ছাড়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তালেবান সরকার। সোমবার (৩১ আগস্ট) ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পর আফগান সরকার তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সময়কে ‘যুক্তরাষ্ট্রের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বলেন, ‘খনি, অবকাঠামো, কৃষি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকে তারা অবশ্যই স্বাগত জানাবে আফগানিস্তান।’ কাবুলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মুত্তাকি।
তিনি আরও বলেন, ‘আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে গত ২০ বছরের যুদ্ধের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয়, বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তিতে দেখা উচিত। আমাদের অর্থনৈতিক নীতি উন্মুক্ত।’ তবে এই প্রস্তাব সরাসরি হোয়াইট হাউসের কাছে দেয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করেননি মুত্তাকি।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সমর্থিত আফগান সরকারের পরিচালিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে তামা, লৌহ আকরিক, নিওবিয়াম, কোবাল্ট, স্বর্ণ ও লিথিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। তবে কয়েক দশকের সংঘাতের কারণে এসব সম্পদের বড় অংশ এখনও উত্তোলন করা যায়নি।
২০২১ সাল থেকে তালেবান চীন ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্বর্ণ, মূল্যবান পাথর ও ইস্পাত তৈরিতে ব্যবহৃত ক্রোমাইটের মতো খনিজের জন্য ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি খনিজ বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বলছেন, ন্যাটো বাহিনীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশটি এখন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে আফগানিস্তান এখনও বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। দেশটির ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে।
দেশটিতে শরিয়া আইনও চালু করেছে তালেবান। এর ফলে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, ব্যবসা ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তালেবান নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা চলতি মাসে সতর্ক করে বলেছেন, মানবাধিকারের মানদণ্ডে বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি না হলে তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, কূটনীতিক সম্পর্ক বা রাজধানীতে বৈঠকের মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিত নয়।
কাবুলে থাকা বিদেশি কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের তালেবানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে মুত্তাকিও রয়েছেন, যিনি কয়েক দশক ধরে তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন। তারা আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আর্থিক প্রবাহ তালেবান সরকারকে আরও শক্তিশালী করতে এবং তাদের কঠোর নীতি পরিবর্তনে বিদেশিদের প্রভাব দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে গত এক বছরে কাবুল কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। চীন, ভারত, ইরান, কাতার ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ তালেবান কর্মকর্তাদের স্বাগত জানিয়েছে। গত বছর রাশিয়া তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার পর মে মাসে সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও করেছে।
জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রথমবারের মতো ব্রাসেলসে তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সম্ভাব্য অভিবাসী প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করে। একই ধরনের আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন জার্মান কর্মকর্তারাও। তালেবান আশা করছে, এসব প্রচেষ্টা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ থাকা আফগান সম্পদ ছাড়ার পথ তৈরি করবে। মুত্তাকি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নির্ধারিত উদ্দেশ্য অর্জন করা যায়নি।’
আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, দেশের ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ এখনো দেশের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলার। মুত্তাকি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি, সরকার বা প্রতিষ্ঠানের আফগান জনগণের সম্পদকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’ তিনি জানান, জব্দ থাকা সম্পদ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর সঙ্গে কাবুল আলোচনা করছে।
তবে ট্রাম্প তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি। তিনি কাবুলের উত্তরে বাগরাম বিমানঘাঁটি আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান। মুত্তাকি বলেন, ‘বাগরামসহ আফগানিস্তানের সব সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা আফগানিস্তানের জাতীয় সম্পদ।’
তবে তিনি হোয়াইট হাউসকে ২০২১ সালে পরিত্যক্ত মার্কিন দূতাবাস আবার চালুর আহ্বান জানান। মুত্তাকি বলেন, ‘তালেবান দূতাবাসটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে... সড়ক পুনর্নির্মাণ করেছে এবং নতুন গাছ লাগিয়েছে।’