‘বাংলাদেশে এক-এগারো রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী করেছে হাসিনা ও খালেদাকে’
11 January 2017, Wednesday
ঢাকা, ১১ জানুয়ারি (জাস্ট নিউজ) : বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি জরুরী অবস্থা জারীর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ড: ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানা কর্মকাণ্ড - বিশেষ করে রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

ক্ষমতাগ্রহণের শুরুতে তাদের ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল কেন? পরবর্তী রাজনীতিতে সেটি কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে? এ নিয়ে নানা বিতর্ক আছে।

২০০৮ সালের নির্বাচন এবং ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের জন্য ড: ফখরুদ্দিন আহমেদের সরকার প্রশংসিত হলেও তাদের রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাপকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা এবং বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দুরে রাখার কিছু তৎপরতা তখন দৃশ্যমান হয়েছিল। কিন্তু সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বিএনপি'র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মনে করেন তৎকালীন সরকার বাস্তবতা আঁচ করতে না পারায় ব্যর্থ হয়েছিল ।

মি: রিজভী বলেন, শুভ ইচ্ছা তাদের মধ্যে ছিলোনা বলেই তারা এই অবজেক্টিভ কন্ডিশনটা তারা অ্যানালাইজ করতে পারেনি যে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কতটুকু জনপ্রিয় সেটা যাচাই করতে পারেনি।

দুর্নীতি-বিরোধী অভিযানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। পরে বিশেষ আদালতে তাদের সাজাও হয়েছিল। বড় দু'টি দল - আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে দলীয় 'সংস্কার' করার উদ্যোগ নিয়েছিল সে সরকার। তাদের ভাষায় রাজনীতি 'ক্লিন বা পরিষ্কার' রাখার জন্যই ছিল সে চেষ্টা।

'শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার অবস্থান আরও সংহত হয়েছে'

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন তথাকথিত রাজনৈতিক সংস্কার চেষ্টা ব্যর্থ হবার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং দলের ভেতরে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার অবস্থান আরও সংহত হয়েছে।

তিনি মনে করেন, দলের ভিতরে এখন এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস বা ইচ্ছা কারো নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, অনেককে তো পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যারা আছে তারা খুব ভীত-সন্ত্রস্ত। কারণ এটা প্রমাণিত হয়েছে যে এই দুই নেত্রীকে ছাড়া বাংলাদেশের পলিটিক্সকে (রাজনীতিকে) সামাল দিতে পারে না এমনকি আর্মিও পারছিলো না।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ড: ফখরুদ্দিন আহমেদের সরকার তাদের কাজের পরিধি এতটাই বিস্তৃত করেছিল যে অনেক বিষয় তাদের আওতার মধ্যে ছিলনা।

দুই শীর্ষ নেত্রীকে রাজনীতি থেকে দুরে রাখার তৎপরতা

শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার এবং তাদের দু'জনকে রাজনীতি থেকে দুরে রাখার যে চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটি বাদ দিলে সামগ্রিকভাবে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে অনেকেই সমর্থন করেছিল।

রাজনীতিবিদরা নাখোশ হলেও রাজনৈতিক সংস্কারের সে উদ্যোগকে নাগরিক সমাজের অনেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সমর্থন করেছিল।

তবে রাজনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, ২০০৭ সালের পরিস্থিতি তাদের আরও সাবধানী করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১/১১র সময় অনেকে সচেতন হয়েছে যে সচেতনতাগুলো ছিলোনা আগে। কিছুটা উদাসীনতা ছিল রাজনীতিবিদদের মধ্যে।

ড: ফখরুদ্দিন আহমেদ সরকার প্রধান থাকলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। কেন তারা দুই নেত্রীকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন, সেটির পরিষ্কার কোন জবাব তার মুখ থেকে পাওয়া কখনোই পাওয়া যায়নি।

তবে মইন ইউ আহমেদ তার প্রকাশিত একটি বইতে লিখেছেন, তাদের চলার পথে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সফলতাই ছিল বেশি।

সে বইয়ের তিনি লিখেছেন.. “তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সব কাজে সহযোগিতা করা কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া নয়” ।

মইন ইউ আহমেদ বর্ণনা করেন, আমি দেশকে লাইন-চ্যুত ট্রেনের সাথে তুলনা করেছিলাম। আমরা ট্রেনটিকে লাইনে উঠিয়ে তার প্রকৃত চালক রাজনীতিবিদদের হাতে দেশকে তুলে দিতে সহায়তা করেছি। আমাদের সর্বাত্মক এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতো যদি জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলো এগিয়ে এসে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ না করতো।

আলোচনা-সমালোচনা যাই থাকুক না কেন, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুন:প্রবর্তনের ১৬ বছর পর রাজনীতিতে নতুন করে সামরিক হস্তক্ষেপ অনেককেই চমকে দিয়েছিল। কিন্তু অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তৎকালীন শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব এবং সরকার একটি গভীর বৃত্ত থেকে সফলভাবে বের হয়ে আসে। -বিবিসি

(জাস্ট নিউজ/ডেস্ক/একে/২১০৩ঘ.)