Monday November 20, 2017
বহিঃবিশ্ব
10 November 2017, Friday
প্রিন্ট করুন
রোহিঙ্গাদের রক্ষার্থে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ১০ প্রস্তাবনা
জাস্ট নিউজ -
ঢাকা, ১০ নভেম্বর (জাস্ট নিউজ) : নভেম্বরের ১০-১৪ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে এশিয়ার শীর্ষ নেতাদের সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলা করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবার বিষয়ে আলোচনা করবেন। এমনটা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো সহ এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) এর অন্যান্য সদস্য দেশের সরকার প্রধানরা ১০ নভেম্বর ভিয়েতনামের দা নং শহরে বৈঠক করবেন।

অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ (আসিয়ান) রোববার ফিলিপাইনের ম্যানিলায় ৩১তম আসিয়ান লিডার্স সামিটে (এশীয় নেতাদের সম্মেলন) অংশগ্রহণ করবে। সেখানে আসিয়ানের পাশাপাশি আরও একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে আসিয়ান নেতারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীইয়ান ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেত্রীবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহন করবেন। এইসব নেতাদের অধিকাংশই আবার ১৩-১৪ নভেম্বর ম্যানিলাতেই অনুষ্ঠিতব্য ইস্ট এশিয়া সামিটে অংশ নেবেন। প্রতিটি সম্মেলনেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোকপাত করা হবে।

উল্লেখ্য, ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী উত্তর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত জাতি নিধণের অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এই অভিযানজুড়ে সে দেশের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। এ পর্যায়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ছয় লাখ তেরো হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সব মিলিয়ে দেশটিকে এখন দশ লাখেরও বেশি বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের বসবাস। এ বিপুল আশ্রয়প্রার্থী জনগোষ্ঠী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দারিদ্রপীড়িত দেশটি। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এই নারকীয় বর্বরতাকে ইতমধ্যেই মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গন্য করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

 এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে বেশ কিছু দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সামরিক সম্পৃক্ততা বন্ধ রেখেছে। সে দেশের সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ সদস্যদের ভ্রমনে আরোপ করেছে নিষেধাজ্ঞা। তবে, এসব পদক্ষেপ যে যথেষ্ট নয়- সেটিও বিবেচনা করছে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। মিয়ানমার এখনো রাখাইনে আন্তর্জাতিক সাহায্যসংস্থা কিংবা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণকারীদের প্রবেশ করতে দিচ্ছেনা। তাই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এবং তাদের অধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করার নিমিত্তে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবার কথা ভাবা হচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া মহাদেশের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেছেন, মিয়ানমারের ওপর কঠোর অবরোধের সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া এশিয়ান সম্মেলন থেকে বিশ্বনেতৃবৃন্দের ঘরে ফেরা অনুচিত হবে। সম্মিলিতভাবে চাপ প্রয়োগ করে মিয়ানমারকে রাখাইনে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচিৎ মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা এবং দেশটির সঙ্গে সব ধরণের সামরিক সহায়তামূলক সম্পর্ক বর্জন করা। যদিও জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন নির্দিষ্ট অবরোধ আরোপ করেনি, তবে নভেম্বরের ৬ তারিখে এই হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানিয়ে একটি সাধারণ বিবৃতি দেয়া হয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। সেখানে, মিয়ানমারে সংঘটিত হওয়া সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে দেশটিকে তা অবিলম্বে বন্ধ করার আবেদন জানানো হয় এবং জাতিসংঘের তদন্তকারীদের মিয়ানমারে প্রবেশ করে সার্বিক পরিস্থিতি অবলোকন করতে দেবার অনুরোধ করা হয়।

অ্যাডামস জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমার ইস্যুতে আরো কঠোর হবার আবেদন জানান। সেই সঙ্গে, এশিয়ার অন্যান্য দেশ মিলে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জোটবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শও দেন তিনি।

আরো উল্লেখ করেন, এশিয়ার এই সিরিজ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা নেতাদের মিয়ানমারে সংঘটিত অপরাদের বিচারে একটি আইনানুগ বিচার প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে অপরাধের সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। এছাড়াও, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচিৎ মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধী আদালতে বিচারের সম্মুখীন করা। জাতি নিধণের যে স্পষ্ট কর্মকাণ্ড সে দেশে সংগঠিত হয়েছে, এ ধরণের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নিমিত্তেই আন্তর্জাতিক অপরাধী আদালতের সৃষ্টি হওয়া- এমন মন্তব্যও করেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকেও এশিয়ার এই সিরিজ সম্মেলনে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তাদের যাতে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া না হয়- নজর রাখা হচ্ছে সে বিষয়েও। তাদেরকে যেন জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না হয় কিংবা ফিরে যাবার পর তারা যাতে আবার নির্যাতনের শিকার না হয়-এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। দশটি নীতিমালা সংবলিত এই প্রস্তাবে নিুোক্ত বিষয় সমূহ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছেঃ

১। যে সব রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদেরকে শরণার্থী হিসেবে গন্য করতে হবে। দিতে হবে পুর্নাঙ্গ শরণার্থী সহায়তা।
২। আশ্রয়দাতা দেশ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহকে যতটা সম্ভব মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থারা পরিস্থিতি বিবেচনা করে বৈষম্যহীনভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
৩। বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত রাখতে হবে।
৪। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আচরণবিধি মেনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করা যাবে না।
৫। মিয়ানমারকে পালিয়ে আশা শরণার্থীদের স্বসম্মানে ফিরিয়ে নিতে হবে।
৬। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে না চাইলে তাদের জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না।
৭। শরণার্থী এবং বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি ফিরিয়ে দিতে হবে। নষ্ট হওয়া স¤পদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৮। শরণার্থীদেরকে তালিকাভুক্ত করা অব্যাহত রাখতে হবে বাংলাদেশকে ।
৯। শরণার্থী শিবিরগুলো টেকসই না হওয়ায় তাতে শরণার্থীদের বসবাস প্রলম্বিত করা যাবে না।
১০। আপাতকালিন সঙ্কট নিরসনে রোহিঙ্গাদের নিজ আবাসভ’মীতে না পাঠিয়ে নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তুলে সেখানে প্রত্যবাসনের যে অভিপ্রায় মিয়ানমারের ব্যক্ত করেছে, তা কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।
(হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এপেক/আসিয়ান সম্মেলন সংক্রান্ত নিবন্ধ এবং রোহিঙ্গা শঙ্কট সমাধানে গৃহীত ১০টি প্রস্তাবনা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের সংক্ষেপিত অনুবাদ)

(জাস্ট নিউজ/ওটি/১৬৪২ঘ.)

মতামত দিন
বহিঃবিশ্ব :: আরও খবর
প্রচ্ছদ
ছবি গ্যালারী
যোগাযোগ