Sunday October 22, 2017
অভিমত
12 August 2017, Saturday
প্রিন্ট করুন
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সচিবের চাকরিচ্যুতি নিয়ে মিথ্যাচার
জাস্ট নিউজ -

শামসুল আলম
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়ার সচিবের চাকরিচ্যুতি নিয়ে এক শ্রেণীর সাংবাদিক মিথ্যাচার করছেন। বরাবরের মত আরেকটি ফালতু প্রোপাগান্ডা এটা। ওরা সব কিছু না জেনেই লিখছেন, আবার জেনেও সত্য গোপন করে অর্ধসত্য প্রচার করছেন।

ওই সময় আমি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলাম। বলা চলে সেই সচিব সাহেবের চাকরি হারানোর প্রক্রিয়াটি আমার হাত দিয়েই সম্পন্ন হয়েছিল। রংচং দেয়া সংবাদে বিভ্রান্ত না হতে তাই কিছু সত্য কথা প্রকাশের চেষ্টা করব।

তাঁর নাম এএইচএম নূরুল ইসলাম। ১৯৭৭ ব্যাচের প্রশাসন সার্ভিসের কর্মকর্তা। ১৯৯২ সালে তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পরিচালক হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার। ৯৪ সালের শুরুতেই তিনি পদায়িত হন ফেনীতে জেলা প্রশাসক, পরে যশোরে জেলাপ্রশাসক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক, আইন ও কেবিনেট বিভাগে উপসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতাসীন হলে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর একান্ত সচিব-১ হিসাবে নিয়োগ দেন নুরুল ইসলামকে। দায়িত্বে বসার পর থেকেই নিজের পছন্দমত পদোন্নতির বিধিমালা তৈরী করতে থাকেন নূরুল ইসলাম। বিধিমালার মারপ্যাঁচে সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে নিজে উপসচিব হতে যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি নেন। তার লক্ষ্য ছিল পরবর্তীতে কেবিনেট সচিব হওয়ার। সে লক্ষ্যে নীরবে কাজ করে যেতে থাকেন। এ উদ্দেশ্যে ১৯৭৩, ১৯৭০ ব্যাচের অফিসারদের নানা অযুহাতে অবসর, বিদেশে পোষ্টিং, রাষ্টদূত করে ব্যুরোক্রেসির মেইন ষ্ট্রীম থেকে সরাতে থাকেন।

অবশেষে ১৩ মাসের মধ্যে তিন ধাপ পদোন্নতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের পদটি দখল করে নেন নূরুল ইসলাম। সচিবের দায়িত্ব পেয়ে দিনকে দিন নূরুল ইসলাম অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠেন। সরকারের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত, এমনকি রাজনৈতিক বিষয়াদিতেও নাক গলাতে শুরু করেন নূরুল ইসলাম।

যে ঘটনাটি একটি সংবাদ মাধ্যম অতি সম্প্রতি ছেপেছে, তাতে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের কথিত দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত নামক বিশাল কাজ করতে গিয়ে চাকরি হারিয়েছেন নূরুল ইসলাম। আসলে একথা সত্য নয়। সত্য এই যে, নুরুল ইসলাম কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সরকার পতনে আ’লীগের ষড়যন্ত্রে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। সকলে অবহিত আছেন যে, ২০০৪ সালের এপ্রিলে বিএনপি সরকার পতনের জন্য আওয়ামীলীগ ডেডলাইন দিয়েছিল ৩০ তারিখ। আ’লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ঘোষণা করেন, তার সেই বিখ্যাত ‘ট্রাম কার্ড’, যাতে তিনি বলেছিলেন ৩০ এপ্রিলই হবে বিএনপি-জামায়াত সরকারের পতনের দিন, ১লা মে বেগম খালেদা জিয়া হবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী! ঐ ট্রামকার্ডকে কেন্দ্র করে আ’লীগ নানান পরিকল্পনা হাতে নেয়। এর মধ্যে আছে ১লা এপ্রিল ১০ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়লে তা নিয়ে ভারতকে উত্তেজিত করা, একটি এনজিও দিয়ে ১০ লাখ লোক নামিয়ে রাজপথ দখলে রাখা, বিএনপির ১০০ এমপি কিনে বিদ্রোহ করানো, শেষে সরকারের পতন ঘটানো ইত্যাদি। কিন্তু সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দ্বারা সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয়া হয়।

ট্রামকার্ডের সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সচিবের দায়িত্বরত নূরুল ইসলাম আওয়ামীলীগের উত্থাপিত দুর্নীতির বায়বীয় অভিযোগের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তারেক রহমান সহ বিভিন্ন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতির তদন্তের জন্য ৫টি মন্ত্রণালয়ে পত্র দেন। এরপরে ঐ একই ধুয়া তুলে ২১শে এপ্রিল হাওয়া ভবন ঘেরাও কর্মসূচী দেয় ছাত্রলীগ। মূলত নূরুল ইসলামের ঐ পত্রটি ছিল জলিলের ট্রাম কার্ডের একটি উপাদান। একটি বেনামী দরখাস্তের ওপর ভিত্তি করে নুরুল ইসলামের এ কর্মকান্ড আবদুল জলিলের ট্রামকার্ডে রসদ সরবরাহ হিসাবে সরকারের তদন্তে প্রতীয়মান হয়। পরে দেখা যায় অভিযোগকারীর কোনো অস্তিত্বই নাই, অথচ বেনামী দরখাস্ত নুরুল ইসলাম তারই নিজের নামে এড্রেস করিয়ে হাতে হাতে জমা নিয়েছেন পত্র, এবং নিজেই তদন্তে পাঠিয়েছেন! নুরুল ইসলাম অফিস প্রধান ছিলেন না, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অফিস প্রধান হলেন মুখ্য সচিব। মুখ্য সচিব বা প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি ব্যতিরেকে এহেন গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাবান ছিলেন না। তা স্বত্ত্বেও নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের বিরুদ্ধে নুরুল ইসলাম যেভাবে উন্মুক্ত তদন্ত করতে চেয়েছিলেন, তার ঐ পদ্ধতি বলে দিচ্ছে- তিনি ৩০ এপ্রিলের ষড়যন্ত্রে জ্বালানি যোগান দিচ্ছিলেন।

আইন অনুয়ায়ী বেনামী পত্র যাওয়ার কথা ডাস্টবিনে, সেখানে তিনি ৫/৬ টি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান, যা থেকে পত্রিকায় ছাপা হয় সে খবর, অতঃপর ছাত্রলীগ হাওয়া ভবন ঘেরাও করার মত দুঃসাহস দেখায়। এ সবই ছিল ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পত্রিকা ও গোয়েন্দা মারফত নুরুল ইসলামের চিঠির খবর জেনে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দু’টি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্ত করান এবং সরকার পতনের কর্মসূচির সাথে নুরুল ইসলাম জড়িত থাকা ও তথ্য পাচারের চেষ্টা প্রমাণিত হওয়ায় জোট সরকার নূরুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক অবসর দান করে ২০০৪ সালের ৪ জুন। আলোচ্য এই সংবাদ মাধ্যমে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী ৩ জুন প্রধানমন্ত্রী খুব সকালে এসে নুরুল ইসলামকে বকা ঝকা করেন। অথচ এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী সেদিন যথাসময়েই অফিসে আসেন। এমনকি নুরুল ইসলামের সঙ্গে সেদিন দেখাও হয়নি তাঁর।

নূরুল ইসলাম যে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন, তার প্রমাণ তিনি নিজেই দিয়েছেন পদে পদে। ১/১১র সময় মইন-ফখরের সরকার বেগম খালেদা জিয়ার নামে ৪/৫টি বানোয়াট দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। ঐ সবগুলো মামলার মাল-মশলা সবকিছুই সরবরাহ করেছিলেন নূরুল ইসলাম। তার দেয়া তথ্য অনুসারে একে একে দায়ের করা হয় নাইকো দুর্নীতি, গ্যাটকো দুর্নীতি, টেলিটকের যন্ত্রপাতি আমদানীতে দুর্নীতি ও জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রায় সকল মামলার উপাদান ও তথ্য আগে থেকেই নূরুল ইসলাম নিজের কাছে জোগাড় করে রেখেছিলেন। ওয়ান ইলেভেন ঘটার ১ মাসের মধ্যেই বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মিডিয়ায় প্রথম মুখ খোলেন নূরুল ইসলাম। দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলী স্টারে একযোগে নূরুল ইসলামের দীর্ঘ সাক্ষৎকার ছাপা হয় ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০০৭।

সাক্ষাৎকারে নূরুল ইসলাম জোট সরকারের দুর্নীতি নিয়ে অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করে বলেন, জোট সরকারের বিগত পাঁচ বছরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী তাঁদের মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়েই সরকারি অর্থ-সম্পদ লুটপাট করেছেন। গ্যাটকো মামলা হওয়ার আগেই নুরুল ইসলাম পত্রিকায় লিখেন, খুব স্পষ্টভাবে মনে পড়ছে, ক্রয় কমিটিতে বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান এ বিষয়ে তদবিরে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসেছিলেন। জোরালো তদবিরের কারণে বাতিল প্রস্তাবটি পুনরায় ক্রয় কমিটিতে ওঠে এবং অনুমোদিত হয়। নূরুল ইসলাম কি করে জানলেন যে, কোকো মায়ের কাছে এ তদবীরের জন্যই এসেছিলেন, নাকি এটি উনার বানোয়াট প্রচারণা - বিরাট প্রশ্ন? শিখন্ডি নূরুল ইসলাম স্বীয় চাকরি হারানোর যৌক্তিক কারণগুলো নিজের অজান্তেই এভাবেই প্রকাশ করতে থাকেন।

(জাস্ট নিউজ/ওটি/১৬৪২ঘ.)



মতামত দিন
অভিমত :: আরও খবর
প্রচ্ছদ
ছবি গ্যালারী
যোগাযোগ