Sunday October 22, 2017
অভিমত
29 November 2016, Tuesday
প্রিন্ট করুন
পুষে রাখা স্মৃতিরা
জাস্ট নিউজ -
লিমি চৌধুরী

বাঙ্গালী মেয়ে মাত্রই বোকা, সিলেটী মেয়েরা এ ক্ষেত্রে স্পেশাল। কত তুচ্ছ কারণে তারা জীবনের বড় বড় ব্যাপার বিসর্জন দিয়ে দেয়! এরা পি.এইচ.ডি. করে ফেলে, বড় বড় জায়গায় বড় বড় কাজ হ্যান্ডেল করে ফেলে কিন্তু পরিবারের কাছে এলেই এরা বড্ড নরম। নাহিদ লিখেছে সে নাকি খুব শক্ত, কিন্তু আমি জানি তার হাতের মতোই তুলতুলে তার হৃদয়, তানজিনা ঠাস ঠাস করে কথা বলে, ভাবখানা বড় কেয়ারলেস, কিন্তু কত বছর ধরে সে তার মায়ের শাড়িটা পরম যতেœ আগলে রেখেছে তা আমি জানি। আমার দাদুকে গ্রামশুদ্ধ মানুষ বলতো ‘বিবি বড় রাগী’, এই রাগী মানুষের ভেতরে যে কত অ-রাগী মন বাস করত তার হিসেব আমি রেখেছি।

নিজের সংগ্রামী জীবনের অনেক তত্ত্বকথা দাদু আমাদের বলতেন। কাহিনী রেখে সবসময় মরালটা বলতেন। ঈশপের গল্প পড়ে আমরা জানতাম মরাল আসে গল্পের পরে, দাদুরটা দেখতাম আগে চলে আসে, ঘটনা কী? একবার দাদু পানি খাচ্ছেন, আমাকে দেখে গ্লাসের পানি দেখিয়ে বললেন, মেয়েদের জীবন হচ্ছে এইরকম, যে পাত্রে ঢালবে সেই আকার ধরবে। আমি বললাম দেখি দেখি। কথা ঠিক, তারপর ঘরে যত আকারের পাত্র আছে সব টেবিলে বিছিয়ে, একটা একটা করে পানিতে ভরিয়ে দিলাম, বাহ! ভেরী ট্রু।
‘লাগলো যে দোল
জলে,স্থলে,বনতলে লাগলো যে দোল
 দ্বার খোল,দ্বার খোল
রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত আকাশে
নবীণ পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল
দ্বার খোল, দ্বার খোল’

গাইছি আর পানি ঢালছি, দাদু দুঃখ মেশানো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেলেন, হয়তো ভেবেছিলেন, যা বোঝে বুঝুক,  আজকে অন্তত গাছে, চালে তো উঠবেনা।

বাবা সবসময় কবিতা লিখে আমার খাতা, কাগজ ভরিয়ে ফেলতেন। একবার হাউসিং কম্পাউন্ড ক্লাব থেকে ম্যাগাজিন বের হবে। আমাদের সবাইকে লিখা দিতে বলা হলো, ব্যাস, হয়ে গেলো। আমি বাবার একটা কবিতা আমার বলে চালিয়ে দিয়ে আসলাম। ওরা খুবই অবাক, এইটুকু একটা মেয়ে এত সুন্দর কবিতা লিখে ফেলেছে! হবে হয়তো, এর বাবা এত জ্ঞানী মেয়ে জ্ঞানী  হতেই পারে। দু’দিন পর উদ্যোক্তাদের একজন বাসায় বেড়াতে এলেন, এসেই বাবাকে বলা শুরু করলেন কবিতার কাহিনী। অসহ্য! বাবারতো তখনই সন্দেহ হলো, আমাকে ডেকে পাঠালেন, আমি এসে বললাম ‘পরে বলবো’। এই লোক চলে যেতেই বাবা আমাকে খপ করে ধরলেন, ‘কোনটা দিয়েছ? তুমি লিখা আর আমি লিখা তো একই কথা।’ তোমার ওই ‘জ্বালো জ্বালো’ টা দিয়ে এসেছি। বাবা হা রে রে করে উঠলেন, ‘ওটাতো কবিগুরুর লেখা!’ আমি এতটাই অবাক হলাম, দু’চার লাইন নয়, পরীক্ষা নয়, কারো আদেশ নয়, তারপরও এতবড় একটা মানুষ, নিজের লিখা নয়, অন্যের লিখা এতবড় একটা কবিতা দাঁড়ি, কমাসহ মুখস্থ করে রেখেছে! বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হায়!আমার এই বোকা মেয়ের জীবন কিভাবে যাবে?’

‘আর আমি ভাবছি ‘হায়! আমার এই বোকা বাবার জীবন কিভাবে যাবে?’ হোয়াট এন আয়রনী!

বাড়ীতে প্রায়ই ডাকপিয়ন আসতো বই নিয়ে, মেঝো চাচা গ্রাহক, টঙীঘরের আলমারি বইময়, বই আসা থেকে, আলমারি পর্যন্ত  গোছানো, টোটাল প্রসেসটাই আমাকে ভীষণ আনন্দ দিতো। আমার এই আদিখ্যেতা দেখে বাবা আমাকে পঁই পঁই করে সাবধান করতেন, ‘খবরদার বই আনতে যেও না কিন্তু’। আচ্ছা।
একদিন বই নেয়ার প্রসেস দেখছি, মেঝ চাচা জিজ্ঞেস করলেন ‘বই নিতে চাও?’ আমি মাথা ডানে-বামে করতে যাবো, কি করে যেনো মাথা উপর নীচ হয়ে গেল। নিতে হলে শর্ত আছে, বই ফেরত দিতে হবে’।  পড়া হয়ে গেলে ওই বই দিয়ে আমি কি করব?  অবশ্যই ফেরত দেব।’ ‘তো নিয়ে যাও।’
‘লাগলো যে দোল
স্থলে, জলে, বনতলে লাগলো যে দোল
দ্বার খোল, দ্বার খোল
বেণুবন মর্মর দখিণা বাতাসে
প্রজাপতি দোলে ঘাসে ঘাসে
মৌমাছি ফিরে যাঁচি ফুলেরও দখিনা
পাখায় বাজায় তার ভিখারির বীণা
মাধবী  বিতানে বায়ু গন্ধে বিভোল
দ্বার খোল, দ্বার খোল।’
বই আনি, পড়ি, ফেরত, আনি, পড়ি,  ফেরত, ভারি মজা! যেদিন ‘ওজের জাদুকর’ আর ‘অলিভার টুইস্ট’ আনলাম, সেদিন পড়া শেষে বই তো আর ফেরত দিতে ইচ্ছে করেনা। আজও মনে আছে কি রকম বুকে পাথর চাপা দিয়ে বইদু’টো ফেরত দিয়ে এসেছিলাম! স্মৃতি জিনিসে থাকেনা স্মৃতি থাকে মনে, শত ঘষলেও তা মুছবার নয়, এই অমোঘ সত্যটা জেনেও, মেয়েদের স্মৃতিকে জমিয়ে রাখার কি প্রবল আকুতি!
মতামত দিন
অভিমত :: আরও খবর
প্রচ্ছদ
ছবি গ্যালারী
যোগাযোগ