Monday May 29, 2017
জাতীয়
17 May 2017, Wednesday
প্রিন্ট করুন
বিচারকদের অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট-মন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব চরমে
জাস্ট নিউজ -
ঢাকা, ১৭ মে (জাস্ট নিউজ) : অধস্তন আদালতের বিচারকদের অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণে পাঠানো নিয়ে চরম দ্বন্দ্বের মুখোমুখি সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়। প্রশিক্ষণে পাঠানোর কর্তৃত্ব নিয়ে আদেশ-পাল্টাআদেশ জারির ঘটনা ঘটেছে। আগামী ২৯ মে এই প্রশিক্ষণে প্রথম দফায় ১২ বিচারককে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা।

জানা গেছে, গত ৩ মে প্রেষণে নিযুক্ত ১২ জন বিচারককে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর জন্য জিও (সরকারি অফিস আদেশ) জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। কিন্তু সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় গত ৯ মে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি সার্কুলার জারি করা হয়।

ওই সার্কুলারে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ ব্যতিরেকে প্রেষণে বা অন্য কোনোভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিদেশে না যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ ছাড়া বিদেশ গেলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ অবস্থায় মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাল্টা একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্ট থেকে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে তা অশোভন ও অনভিপ্রেত। রাষ্ট্রপতি যে অনুশাসন দিয়েছেন তা সব প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে প্রেষণে বা অন্যভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিদেশ গমনের বিষয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুশাসনের বিপরীতে অন্য কোনো অনুশাসন বা র্সার্কুলার জারি কার্যকর নয়।

জানা গেছে, বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিচারকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। গত বছরের মাঝামাঝি সরকারের সঙ্গে এ চুক্তি হয়। এ জন্য সরকার ৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এ প্রকল্পের আওতায় তিন বছরে অধস্তন আদালতের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি (৫৪০ জন) বিচারক অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন। বিচারকদের সন্ত্রাসবাদ, সাইবার ক্রাইম, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত (স্পেশালাইজড) বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে প্রেষণে নিযুক্ত ১২ বিচারককে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে গত ৩ মে একটি অফিস আদেশ জারি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ সপ্তাহের এই সংক্ষিপ্ত কোর্সে তারা অংশ নেবেন। এর মধ্যে আইন কমিশনের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-সচিব ও তিনজন সিনিয়র সহকারী সচিব, বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের পরিচালক (গবেষণা ও প্রকাশনা), দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক (আইন), আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের উপ-পরিচালক (প্রশিক্ষণ), আইন কমিশনের অনুবাদ কর্মকর্তা, প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার একজন সহকারী পরিচালকের নাম রয়েছে। এই অফিস আদেশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর প্রেষণে নিযুক্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।

এরপর গত ৯ মে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি সার্কুলার জারি করা হয়। এতে বলা হয়, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান মহামান্য রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এবং সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শক্রমে তা প্রযুক্ত হয়। ফলে, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলাবিধান, বিদেশ গমন ও চাকরির অন্য শর্তাবলী ইত্যাদি সব বিষয় উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নির্ধারণ করা অনস্বীকার্য। ফলে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা প্রেষণে বা অন্য কোনোভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাদের চাকরির শর্তাবলী, বিদেশ গমন ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে পরামর্শ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা আবশ্যক।

সার্কুলারে আরো বলা হয়েছে, সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের হাতে ন্যাস্ত। সংবিধানের ১০৯, ১১৬, ১১৬(ক) অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের মাসদার হোসেন মামলার রায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জুডিশিয়াল সার্ভিস ও এই সার্ভিসের সদস্যদের অন্য সব সার্ভিস থেকে পৃথক এবং স্বাতন্ত্র্য মর্যাদা প্রদান করেছে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা যেখানেই কর্মরত থাকেন না কেন সর্বাবস্থায় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাই থাকেন। কেবল প্রেষণে বা অন্যভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বিভিন্ন দফতর বা কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের কারণে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা তার নিজ সার্ভিস সদস্যের বৈশিষ্ট্য হতে বিচ্যুত হন না বা এরূপ বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় বিচারিক পদে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা, আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অফিসে প্রেষণে বা অন্যভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ ব্যতিরেকে বিদেশ গমন না করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হল। পরামর্শ ব্যতিরেকে বিচারিক পদে কর্মরত, প্রেষণে বা অন্যবিধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বিদেশ গমন করলে এই সার্কুলারে প্রদত্ত আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই সার্কুলারের একটি কপি গত ১১ মে আইন মন্ত্রণালয়েও পাঠায় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। এর আগে ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিও প্রায় একই ধরনের একটি সার্কুলার জারি করে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন।

এরপর মঙ্গলবার বিকালে আইন মন্ত্রণালয় একটি পাল্টা সার্কুলার জারি করেছে। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (প্রশাসন) তৈয়বুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই সার্কুলারে বলা হয়, ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের এক পত্রে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অফিসে প্রেষণে বা অন্যবিধিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাদের চাকরির শর্তাবলী, বিদেশ গমন ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে পরামর্শ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। অধস্তন আদালতের বিচারকরা প্রেষণে কর্মরত থাকাকালীন বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ গ্রহণের কোনো আবশ্যকতা নেই মর্মে রাষ্ট্রপতির সদয় অনুমোদন গ্রহণ করে অত্র বিভাগে ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল তারিখে এক পত্রমূলে জারি করা হয়। সুপ্রিমকোর্টকে অবহিত করে ওই চিঠির অনুলিপি প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রপতির ওই অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেষণে বা অন্যভাবে কর্মরত অনেক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ ব্যতিরেকে সরকারি আদেশে বিদেশ গমন করেছেন এবং এখনও বিদেশে গমন করছেন। এ সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির অনুশাসন অগ্রাহ্য করে প্রেষণে নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিদেশ গমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক মর্মে ৯ মে এক সার্কুলার জারি করেছে।

রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পত্র জারির পর বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক ওই সার্কুলারে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ ব্যতিরেকে প্রেষণে বা অন্যবিধিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিদেশ গমন করলে তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে মর্মে যে বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে- তা অশোভন ও অনভিপ্রেত। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি যে অনুশাসন দিয়েছেন তা প্রজাতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে প্রেষণে বা অন্যভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিদেশ গমনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির অনুশাসনের বিপরীতে অন্য কোনো অনুশাসন বা সার্কুলার কার্যকরি নয়। যুগান্তর থেকে নেয়া

(জাস্ট নিউজ/ওটি/১০৫৫ঘ.)
মতামত দিন
জাতীয় :: আরও খবর
প্রচ্ছদ
ছবি গ্যালারী
যোগাযোগ