Saturday September 23, 2017
অভিমত
01 May 2017, Monday
প্রিন্ট করুন
কাঁদো ভাটির মানুষ তোমরা কাঁদো
জাস্ট নিউজ -

নির্মোহ নীলগিরি

এপ্রিলের শুরুর দিকে নেত্রকোনা থেকে আমার এক ফুফু ফোন করে আহাজারি করে বললেন ‘মাইয়া গো ঢলের পানিতে সব ধান তলাইয়া গেছে। বানের লগে ভাইসা আইতাসে মাইনসের লাশ’। আমি উনাকে কোন রকম সান্ত্বনা দিয়ে ফোন রেখে দিলেও উনার কণ্ঠের হাহাকার মাথা থেকে দূর করতে পারছিলামনা। ফেসবুকেও মন দিতে পারলামনা আর এ সম্পর্কিত কারো কোন স্ট্যাটাসও চোখে পড়লোনা। অনলাইনে দেশের পত্রিকা গুলোতেও নেই কোন আপডেট। পরে দেশের কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম সেখানকার অবস্থা। দুই একজন এই খবরটাকে তেমন গুরুত্ব দিলনা কয়েকজন আমাকে সাতপাঁচ বুঝাতে চাইলো। আমার লন্ডন লাইফের খবর জানতেই তারা দেখলাম বেশি আগ্রহী। আমি আর কথা বাড়ালামনা। দৈনন্দিন কাজের চাপ, সামাজিকতার নানা আনুষ্ঠানিকতার ব্যাস্ততার মাঝে নিউজ দেখলাম রাষ্ট্রপতি হেলিকপ্টারে করে হাওর অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে গিয়েছেন।

ছবিতে দেখলাম রাষ্ট্রপতি মহোদয় হেলিকপ্টারের জানালা দিয়ে নিচে ডুবে যাওয়া হাওরের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছেন। তারপর তিনি ‘গার্ড অফ অনার’ নিয়ে সেখানকার সরকারি ও সরকারদলীয় কর্তাব্যাক্তিদের নিয়ে মতবিনিময় করে সার্কিট হাউজে রাত্রি যাপন করেছেন। বাহ বাহ বাহ অতি মনোরম প্রকৃতি দর্শন ও অবকাশ যাপন।

সবই ঠিক আছে কিন্তু আমার কথা হল এরপর উনি মানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি করেছেনটা কি। নিজে ভাটি অঞ্চলের মানুষ হয়েও হাওরের অসহায় মানুষ গুলোর পাশে না দাঁড়িয়ে স্বার্থপরের মত চলে আসলেন লন্ডনে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নাম করে ‘ব্রিটিশ সামার’ উপভোগ করতে।

যাই হোক এরই মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাওরের বর্তমান চালচিত্রের একটা ধারনা পাওয়া যাচ্ছিলো। কিছু কিছু সংবাদ মাধ্যমেও ক্ষয়ক্ষতির খবর দেখতে পেলাম।

গত ২৭ মার্চ থেকেই আগাম বন্যায় প্লাবিত হতে শুরু করে দেশের হাওর অঞ্চল। পানির প্রবল তোড়ে তাসের ঘরের মতো একের পর এক ভেঙ্গে যায় সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া বাঁধ গুলো। আকস্মিক বন্যায় নিমজ্জিত হয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মৌলভীবাজার জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। তলিয়ে যায় ১৪২টি ফসলি হাওরের সব ফসল। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নারীপুরুষ নির্বিশেষে স্থানীয় জনগণ শেষমুহূর্ত পর্যন্ত বাঁশ, বালির বস্তা দিয়ে বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে যায়। কৃষকের গোলায় উঠার অপেক্ষায় থাকা প্রায় পাকা ধান মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায় ভারত থেকে আসা প্রমত্ত পাহাড়ি ঢলের ঘূর্ণিপাকে। কৃষকের ঝাপসা চোখের সামনেই সোনার ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। বিষাক্ত পানিতে মরে ভেসে উঠতে থাকে ছোটবড় সকল মাছ। ঝাঁকে ঝাঁকে মরতে শুরু করে হাঁস, পাখি সহ অন্যান্য জলজ প্রাণী। ভেঙ্গে পড়ে হাওর অঞ্চলের ইকোসিস্টেম।

এখন শুধু মরার বাকি আছে মানুষ। সরকারি ত্রাণ এখনো পৌঁছায়নি। ফসল তুলতে না পারায় খুব শীঘ্রই সেখানে চরম খাদ্য সঙ্কট দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাকসুদুল হাসান খান জানান, বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ ভেঙে হাওর প্লাবিত হওয়ায় মোট এক হাজার ২৭৬ মেট্রিক টন মাছ নষ্ট হয়েছে এবং তিন হাজার ৮৪৪টি হাঁস মারা গেছে। একইদিন সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্ বলেন, বন্যায় দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। যেখান থেকে ছয় লাখ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যেতো।

এরপর প্রধানমন্ত্রী কি করলেন? ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেখে তিনি ভৎসনা করলেন সচিবদেরকে। তারপর আরো রাগান্বিত হলেন সাংবাদিকদের উপর কেন তারা হাওরের খবর প্রকাশ করেছে। হাওরবাসির কান্না, হাহাকার, আহাজারি এতদূরের গনভবন পর্যন্ত এখনো পৌঁছায়নি ।

কাঁদো ভাটির মানুষ তোমরা কাঁদো ।

এই বিস্তীর্ণ এলাকার হাজার হাজার মানুষের এত ক্ষতি হবার পরেও এক সচিব বলেন, দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার জন্য নাকি সেই এলাকার অর্ধেক মানুষের মৃত্যু হতে হবে। সুরক্ষিত সচিবালয়ের এসি রুমে বসে উনারা পরিসংখ্যান নিয়ে অপেক্ষা করছেন হাওরের মানুষ গুলো না খেয়ে মরলে তখন তারা দুর্গত এলাকা ঘোষণা দিয়ে বিদেশ থেকে পয়সা এনে তা লুটেপুটে খাবেন। নিজেদের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াবেন। সচিব সাহেব আপনার প্রধানমন্ত্রীকে বলুন সেই দিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন পত্রিকার পাতা মেললেই দেখতে পাবেন নাখেয়ে মরার পাশাপাশি দাদনের ঋণে জর্জরিত, হাওরের অসহায় মানুষেরা একের পর এক গলায় দড়ি দিয়ে মরছে। তখন আর দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার জন্য পরিসংখ্যানগত কোন জটিলতা থাকবেনা।

এ মৌসুমে চৈত্রের শেষ দিকে অতিবর্ষণে প্রথম দফায় পানিতে তলিয়ে যায় হাজার-হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি। তার পরেও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কাররই। আর হলেই বা কি?

বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের লোকজনের লাগামছাড়া দুর্নীতির কারনেই এত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাজ না করেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, পিআইসির সদস্যরা আর দলীয় ঠিকাদারেরা মিলে নতুন বাঁধ নির্মাণ ও পুরনো বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ নিজেদের পকেটস্ত করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই ভাগবাটোয়ারার প্রসাদ থেকে বঞ্চিত হননি।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর’ নামে একটি অধিদপ্তর রয়েছে। বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের এই মহাবিপদ যাকে স্থানীয়রা ‘আল্লার গজব’ বলছেন, সে সময় হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ৫শীর্ষ কর্মকর্তার ৪ জনই ১৮ এপ্রিল কানাডা সফরে গেছেন। তারা হলেন মহাপরিচালক মজিবুর রহমান, পরিচালক(প্রশাসন)নুরুল আমিন, পরিচালক(জলাভুমি)ডঃরুহুল আমিন, উপ-পরিচালক(প্রশাসন)নাজমুল আহসান । এই আনন্দ ভ্রমণে তাদের সঙ্গে রয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাওর সংশ্লিষ্ট ৩ কর্মকর্তা এবং অন্য মন্ত্রণালয়ের আরো ২ কর্মকর্তা ।

হাওর এলাকা নিয়ে ‘হাওর মাস্টারপ্লান’ নামের সরকারি যে উচ্চাভিলাসী প্রকল্প রয়েছে, তার সুফল কতটা হাওরবাসি পাচ্ছে আর কতটা লাভবান এটি বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টরা হচ্ছেন তা এইবারেই বুঝা গেছে। এতো শিয়ালের কাছে মুরগি গচ্ছিত রাখার মত বিষয় হয়েছে।

এই অঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয় বৈশাখ মাসে। কিন্তু উঠতি পাকা ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিলীন হয়ে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। চোখের সামনে ডুবে যাওয়া সোনালী ধানের সাথে সাথে মৃত্যু হয়েছে তাদের সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষার। এখন বিরূপ প্রকৃতির সাথে আজীবন লড়াই করা এই স্বপ্নহীন মানুষ গুলোকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ বাঁচলেই না পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য তারা উঠে দাঁড়াবে।

লেখকঃ সাংবাদিক

এখানে প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব, জাস্ট নিউজ বিডি ডটকম’র সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভুক্ত নয়।
মতামত দিন
অভিমত :: আরও খবর
প্রচ্ছদ
ছবি গ্যালারী
যোগাযোগ