Sunday October 22, 2017
অভিমত
25 September 2016, Sunday
প্রিন্ট করুন
বিবেক, তোমাকে জাগতে হবে
জাস্ট নিউজ -
আমিমুল এহসান তানিম

সময় একটু বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য যারা বলতে, লিখতে ও করতে ভালোবাসেন, তা তাদের সুচিন্তিত মস্তিষ্ক ও আত্মাকে প্রশান্ত করে। মুক্ত চিন্তা বা উদার মননশীলদের জন্য বাংলাদেশ যে এতো কঠিন হয়ে যাবে তা হয়তো বিশ্লেষকদের ধারণার বাইরে ছিল।

একটি সমাজ বা রাষ্ট্র তখনি স্বয়ং সম্পূর্ণভাবে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়, যখন রাষ্ট্রশক্তি (সামরিক, আধাসামরিক), বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি সমানভাবে অগ্রসর হয়। শুধুমাত্র শক্তির পূজা বা প্রদর্শন করে আর বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকে বন্ধ করে বা গলাটিপে ধরে কোন জাতি সমৃদ্ধ হয়েছে এই নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বাংলাদেশের সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সকল রাষ্ট্রশক্তি  নিয়ে যেন ঝাপিয়ে পড়েছে মুক্ত চিন্তার ধারক ও বুদ্ধি বিবেক সম্পন্ন নাগরিকদের ওপর।

রাষ্ট্রশক্তির অন্যতম উৎস আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী, মাঝে মধ্যে তারাএমন কিছু কর্মকান্ডে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে যা মানবতাকে লাঞ্চিত করার শামিল, যা পাকসেনাদের বর্বরতাকেও হার মানায়।

লেখক, গবেষক বা চিন্তাশীল গনতন্ত্রমনা নাগরিকদের ক্ষেত্র সংকুচন করার প্রায় সব আয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তিদের হুমকি-ধমকিতে প্রতিনিয়ত তটস্থ প্রকৃত শান্তির বাহকরা, যারা সরকারে সমালোচনা করেন, অবস্থান গ্রহণ করেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিনই থাকতে হচ্ছে ভয়ানক আতঙ্কের মধ্যে, না জানি কখন একদল মানুষ এসে তুলে নিয়ে যায় তাদের প্রিয় মানুষটিকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে। যেখানে গেলে অনেকেই আর ফিরে আসেন না আবার কেউ কেউ ফিরে আসেন লাশ হয়ে এবং সাথে থাকে মিথ্যা বন্দুক যুদ্ধের অপবাদ। আবার অনেকেই ফিরে আসেন জীবন নিয়ে কিন্তু চিরচেনা সেই আগের রূপে নয় আসেন নিশ্চল দেহ নিয়ে পঙ্গুর বেশে।

বিশ্বের সকল প্রতিনিধিত্বশীল মানবাধিকার সংস্থাগুলো এক যোগে বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে বিরোধী মতকে দমনের চেষ্টায় লিপ্ত। তাদের মতে সরকারের বিরোধীমত দমনের এই পন্থা অমানবিক ও মানবধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।

অ্যামন্যাস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের ২০১৫/২০১৬ এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অংশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকান্ডকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছে সংক্ষেপে তার কিছু অংশ তুলে ধরলাম

ÒEnforced disappearances, member of the security force in plain clothes arrested dozens of people and later denied knowledge of their whereabouts. Independent media outlets critical of the authorities came under severe pressureÓ

আমেরিকা থেকে পরিচালিত বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানবাধিকার সংস্থা হিউমান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রকাশিত ২০১৬ ওয়ার্ল্ড প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে মন্তব্য

The ruling Awami League entered office promising zero tolerance for serious human rights abuses, but such abuses have continued unabated and in some areas have increased. The detective branch of the police, the Bangladesh border guards(BGB), and the Rapid Action Battalion (RAB) have been responsible for serious abuses, including arbitrary arrests, torture, enforced disappearances, and killings.

উপরোক্ত উদাহরণ দেবার উদ্দেশ্য হলো এটাই যে, আমি ভুল বলছি না বা অপপ্রচারক নই তা বুঝানোর জন্য। সবচে বেশি আশ্চর্যের বিষয় হলো এটাই যে এই সকল মানবাধিকার সংস্থার মন্তব্য যেখানে পৃথিবীর সব অত্যাচারীদের জন্য মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বা গুরুত্ব দিয়ে থাকে সেখানে বাংলাদেশ সরকার এইসব প্রতিবেদনকে পাত্তাই দিতে চায়না। বিভিন্ন ইস্যুতে এই সকল মানবতাবাদী সংগঠনগুলো সরকারকে যতবার মানবাধিকার রক্ষার আহবান জানিয়েছে সরকার ততবারই তাদেরকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করেছে। মানবতাবাদীদের প্রতি সরকারের এই অবজ্ঞা দেখে অনেক সরকারপন্থীদের বলতে শুনেছি যে, বাংলাদেশ নাকি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছে তাই এখন আর এই সকল সংস্থার কথায় সরকার গুরুত্ব দিচ্ছেনা বা দিবার প্রয়োজন মনে করছে না। দেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারাটা একজন নাগরিক হিসেবে আমার কাছেও অতি গর্বের। কিন্তু উঁচু মাথা নিচু করে যখন দেখি সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃকগুলিতে নিহত বাংলাদেশির লাশ সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে নিয়ে আশা হচ্ছে, ফারাক্কার সকল গেট খুলে দেয়ার কারণে নিচু এলাকা পানির নীচে তলিয়ে যাচ্ছে আর বাংলাদেশ সরকার দেখেও না দেখার ভান করছে, তখন সকল হটকারিতা পরিষ্কার হয়ে যায়।

বিবেক তোমাকে জাগতে হবে। আর সেটা হলো জাতির বিবেক। অনেকে মানুক আর না মানুক যে সাংবাদিকতা যুগ যুগ থেকে চলে আসছে, যে সাংবাদিকরা জাতির বিবেক আর কোনো জাতির এই স্পর্শকাতর অংশটিতে যদি কখনো ছাড়পোকা বাসা বাঁধে তাহলে সে জাতির কপালে দীর্ঘ বা স্বল্প মেয়াদি দুর্ভোগ আসবেই আসবে। এটাই সত্য এবং যৌক্তিক।

কিছুদিন আগে রামপাল ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাংবাদ সম্মেলন করলেন জাতির এই মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে রেখে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র জাতির বা সুন্দরবনের জন্য মহাবিপদের কারণ সেই সম্পর্কিত যথেষ্ট তত্ত্ব এবং উপাত্ত্ব জানার পরও জাতির বিবেকের প্রধান প্রধান দরজা যারা তারা নিজেদেরকে চাটুকারিতার এমন পর্যায়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন যা প্রধানমন্ত্রীকেও অপ্রস্তুত করে ফেলে ছিলো। একজন সাংবাদিকের করা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেই ফেললেন বেশি কথা বললে সকল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করে দিবেন। তার এমন বীরত্বপূর্ণ কথার জবাবে জয়-ই মামুনদের নিজস্ব হাসি তাদের অন্ত:সার শূণ্য বিকিয়ে যাওয়া সত্তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছিল যেন।

দোয়া করি আল্লাহ যেন শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের মর্যাদা তাঁর কৃপায় বাড়িয়ে দেন। আইন করে কারো মর্যাদা-সম্মান বাড়ানো বা কমানো বাতুলতা মাত্র! তাহলে কি শুধুই আইন করে সম্মান বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে? সরকারের সব অপচেষ্টায় কলম হাতে যখনি বাঁধা প্রদান করবেন মাহমুদুর রহমান, শফিক রেহমান অথবা শওকত মাহমুদ মত সাংবাদিকেরা তখনি হয়তো তাদেরকে বরণ করতে হবে যাবৎজীবন কারাভোগ অথবা কোটি টাকার জরিমানা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি টোম্যান এর বাক স্বাধীনতা নিয়ে একটি উক্তি দেয়ার প্রয়োজনীতা অনুভব করছি

Once a government is committed to the principle of silencing the voice of opposition, it has only one way to go, and that is down the path of increasingly repressive measures, until it becomes a source of terror to its citizens and creates a country where everyone lives in fear. (Special massage to the congress on the internal security of the United States, August 8, 1950)_ Harry Truman

এই মুহুর্তে সমাজের আরেক বিবেক, সাংবাদিক ও ছড়াকার আবু সালেহ এর ওই উক্তিটি খুব মনে পড়ছে
“ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা
 রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা।”

লেখক : টিভি উপস্থাপক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

এখানে প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব, জাস্ট নিউজ বিডি ডটকম’র সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভুক্ত নয়।
মতামত দিন
অভিমত :: আরও খবর
প্রচ্ছদ
ছবি গ্যালারী
যোগাযোগ